মঙ্গলবার ৩০ মে ২০২৩ ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

ঢাকায় পাবলিক টয়লেটে বেশি ভোগান্তিতে নারীরা
প্রকাশ: সোমবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৩, ০৯:৪০ অপরাহ্ণ

মতিঝিলের একটি বেসরকারি কোম্পানির চাকুরে আকলিমা বেগম। বিকেল সাড়ে ৪টায় অফিস শেষ করে মিরপুরগামী একটি বাসে ওঠেন। শাহবাগ যাওয়ার পরপরই তার টয়লেটে যাওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কিন্তু আশপাশে কোথাও পাবলিক টয়লেট খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তবে ফার্মগেটে আনন্দ সিনেমা হল সংলগ্ন একটি পাবলিক টয়লেটের কথা তিনি আগে থেকেই জানতেন। তাই কষ্ট সহ্য করে আধা ঘণ্টা পর ফার্মগেটে নামেন। ১০ টাকায় টিকিট কেটে ব্যবহার করেন পাবলিক টয়লেট।

নগরে পাবলিক টয়লেট সংকটের মধ্যে নারীদের ভোগান্তির বিষয়ে জানতে চাইলে আকলিমা বেগম পাবলিক টয়লেট সংকট বা ভোগান্তির কথা বলে শেষ করা যাবে না। বাসে চলার পথে সব সময় আতঙ্কে থাকতে হয়। যে খাবার খেলে টয়লেটের চাপ তৈরি হয় তা এড়িয়ে যাই। কারণ, রাস্তাঘাটে চাপ পেলে কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকে না। একথা কাউকে বলতেও পারি না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা চেপে বাসায় চলে যাই।

পুরান ঢাকার নয়াবাজার থেকে লক্ষ্মীবাজারে ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজে মেয়েকে রিকশায় আনা-নেওয়া করেন মা পারভীন জামান। মঙ্গলবার (২১ মার্চ) সকাল সাড়ে ৯টায় মেয়েকে কলেজে দিতে যান তিনি। ফেরার সময় তার টয়লেট চাপে। তখন এক রিকশাচালকের কাছে বাহদুর শাহ পার্কে একটি পালবিক টয়লেটের খোঁজ পান। পাঁচ টাকার টিকিট কেটে টয়লেট ব্যবহার করেন তিনি।

সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে পারভীনের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। তিনি বলেন, কাছাকাছি পাবলিক টয়লেট থাকায় সমস্যা হয়নি। টয়লেটের পরিবেশ বাসার মতোই পরিষ্কার। নারী-পুরুষের জন্য আলাদা ব্যবস্থা আছে। তবে নারীদের সংকট বেশি। চাইলেই যে কোনো জায়গায় প্রয়োজনীয় কাজ সারা যায় না। নারীদের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে নগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা জরুরি।

ঢাকা শহরে পাবলিক টয়লেট সংকটের কারণে নাগরিকদের এ ভোগান্তির চিত্র প্রতিদিনের। নগরে জনসংখ্যার তুলনায় পাবলিক টয়লেট অত্যন্ত অপ্রতুল। ফলে নগরের প্রায় দুই কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েন। কিন্তু তারপরও পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট নির্মাণে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এখন পুরো ঢাকা শহরে ডিএনসিসি ও ডিএসসিসিতে মাত্র ১৩৮টি পাবলিক টয়লেট আছে।

বেসরকারি এনজিও সংস্থা ওয়াটার এইড বছর তিনেক আগে পাবলিক টয়লেট নিয়ে একটি জরিপ চালিয়েছিল। সেই জরিপের তথ্য মতে, ঢাকায় বসবাসরত ও বহিরাগত মিলিয়ে এক কোটি মানুষ প্রতিদিন চলাচল করে। কিন্তু তাদের ব্যবহারের জন্য পর্যন্ত টয়লেট নেই। করপোরেশনের বিদ্যমান টয়লেটগুলোও সব সময় পরিষ্কার থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা শহরে বিভিন্ন স্থানে নান্দনিক নকশায় ৩১টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করেছে ওয়াটার এইড। তাদের প্রতিটি টয়লেটে নারী-পুরুষ এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য অবকাঠামো ব্যবস্থা আছে। এছাড়া এসব টয়লেটে নারীবান্ধব পরিবেশ ও নারী কেয়ারটেকার, বিশুদ্ধ খাবার পানি, সাবান, ওজু এবং গোসলের ব্যবস্থা আছে।

ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ১৩৮টি পাবলিক টয়লেট রয়েছে। এর মধ্যে ডিএসসিসিতে ৯১টি। আর ডিএনসিসিতে ৪৭টি। এই দুই সিটি করপোরেশনে আরও প্রায় ১০টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণের কাজ চলছে। নতুন নির্মাণ করা প্রতিটি পাবলিক টয়লেটে ভাসমান মানুষের কথা বিবেচনায় রেখে টয়লেটের অভ্যন্তরে বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি, গোসলখানা, শিশুদের দুধ খাওয়ানোর কক্ষসহ সার্বক্ষণিক বিদ্যুতের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য টয়লেটের বাইরে স্থাপন করা হয়েছে সিসি ক্যামেরা।

আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় কালো কাচে ঘেরা আধুনিক একটি ভবন। ভবনের স্থাপত্যের চেয়ে বেশি নজর কাড়ে ভবনের গায়ে বড় নেমপ্লেট, লেখা ‘পাবলিক টয়লেট’। সুবিশাল এ ভবনের গায়ে ‘পাবলিক টয়লেট’ লেখা দেখে চলার পথে সবাই অবাক হন। সরেজমিনে দেখা যায়, তিনতলা এ ভবনটি মূলত একটি গ্রন্থাগার। এর নাম ‘আজিমপুর নগর পাঠাগার’। এর নিচতলায় রয়েছে পাবলিক টয়লেট। এটি জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ টাকা দিয়ে টয়লেট ব্যবহার করছেন। টয়লেটের পরিবেশ বাসা-বাড়ির মতোই পরিচ্ছন্ন।

পাঁচ টাকা দিয়ে এই টয়লেট ব্যবহার করেছেন হাজারীবাগের বাসিন্দা ইলিয়াস হোসেন। তিনি বলেন, এখানে পাবলিক টয়লেট হওয়ায় পথচারীদের অনেক উপকার হয়েছে। টয়লেটের পরিবেশ খুবই সুন্দর। অনেকের বাসাবাড়িতেও এমন পরিচ্ছন্ন টয়লেট নেই। এভাবে যদি ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে টয়লেট স্থাপন করা হয়, নাগরিকদের দুর্ভোগ কমবে।

এই টয়লেটে পুরুষদের অংশে দায়িত্ব পালন করছিলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী শাহীন। তিনি বলেন, গত ২ মার্চ এই টয়লেটসহ পাঠাগারটি উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রতিদিন প্রচুর মানুষ টয়লেট ব্যবহার করতে এখানে আসেন। পরিবেশ ভালো দেখে অনেক নারীও টয়লেট ব্যবহার করেন।

খিলগাওঁয়ের আবুল হোটেল এলাকায় রাস্তার পাশে ফুটপাতের এক কোণে মুত্রত্যাগ করছিলেন পথচারী জামাল মিয়া। জানতে চাইলে তিনি বলেন, মালিবাগ থেকে হেঁটে রামপুরা রওয়ানা দিয়েছি। পথে প্রস্রাবের চাপ পেয়েছে। কিন্তু আশপাশে পাবলিক টয়লেট দেখতে পাইনি। চাপ সামলাতে না পেরে ফুটপাতে এক কোণে কাজ সারছি। যদিও এটা আমার অন্যায় হয়েছে। নগরে পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট থাকলে এমন পরিস্থিতি হতো না। চলার পথে কেউ ফুটপাত বা রাস্তায় টয়লেট করতো না। বা কাউকে টয়লেট চেপে বাসা পর্যন্ত যেতে হতো না।

নগরে পাবলিক টয়লেট আরও বাড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পরিবেশ, জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সার্কেল) মোহাম্মদ আবুল কাশেম ডিএনসিসি নাগরিকদের যে সেবাগুলো দেয় তার মধ্যে পাবলিক টয়লেট অন্যতম। ডিএনসিসির নিজ অর্থায়নে নতুন ৪৭টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে। আরও সাতটি পাবলিক টয়লেট নির্মাণের কাজ চলছে।

তিনি বলেন, ডিএনসিসির নতুন সবগুলো পাবলিক টয়লেট আধুনিক নকশায় করা হয়েছে। এসব টয়লেট ব্যবহারে নাগরিকরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ভবিষ্যতে নগরের জনগুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আরও পাবলিক টয়লেট স্থাপনের পরিকল্পনা আছে।

প্রায় একই কথা বলেন ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী সালেহ আহম্মেদ।

ঢাকায় ওয়াটার এইডের ৩১টি আধুনিক টয়লেট স্থাপন

ঢাকায় নাগরিক দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে নিজ উদ্যোগে নগরের বিভিন্ন এলাকায় ৩১টি পাবলিক টয়লেট স্থাপন করেছে বেসরকারি এনজিও সংস্থা ওয়াটার এইড। এসব টয়লেট পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ওয়াটার এইড নিয়োগ করেছে পেশাদার ক্লিনিং প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের। এছাড়া টয়লেটের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কমিটিও গঠন করেছে সংস্থাটি। কমিটি নিয়মিত টয়লেটের ব্যবস্থাপনার তদারকি করে। টয়লেটের নামে খোলা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয় টয়লেট ব্যবহারকারীদের থেকে প্রাপ্ত অর্থ। সেই অর্থ কমিটির মাধ্যমে টয়লেট পরিচালনা, কর্মীদের বেতন, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ ও মেরামত কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ওয়াটার এইড সূত্র জানায়, চাহিদার তুলনায় ঢাকা শহরে পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা নিতান্তই অপ্রতুল। টয়লেটগুলোর ব্যবস্থাপনা ভালো ছিল না। নারীবান্ধব, স্বাস্থ্যকর ও প্রতিবন্ধী মানুষের ব্যবহারের উপযোগী ছিল না। ফলে বাধ্য হয়ে যেখানে-সেখানে এবং নোংরা টয়লেটেই মল-মূত্র ত্যাগ করতেন অনেকে। এমন পরিস্থিতিতে পাবলিক টয়লেট মানুষের ব্যবহার উপযোগী করতে ২০১৪ সালের ২৬ আগস্ট ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি), ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি), ঢাকা ওয়াসা এবং ওয়াটার এইডের মধ্যে চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী দুই সিটি করপোরেশনের জায়গায় ৩০টি মানসম্মত পরিচ্ছন্ন টয়লেট নির্মাণ ও পরিচালনা করে ওয়াটার এইড। পরে বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে আলাদা আরেকটি চুক্তি করে ওয়াটার এইড।

এখন ওয়াটার এইডের তত্ত্বাবধানে গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল, গুলশান-২, নাবিস্কো, তেজগাঁও সাত রাস্তা, মোহাম্মদপুর, মহাখালী, শ্যামলী, তেজগাঁও ট্রাক টার্মিনাল, ঢাকা চিড়িয়াখানা, ফার্মগেট, মিরপুর-১২, আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড, মহাখালী কাঁচাবাজার, মহাখালী জামান ফিলিং স্টেশন, পান্থকুঞ্জ পার্ক, মানিকনগর, ওসমানী উদ্যান (দুটি), মুক্তাঙ্গন, বাহাদুর শাহ পার্ক, সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল (তিনটি), দয়াগঞ্জ বাজার (দুটি), ঢাকা জেলা প্রশাসন (তিনটি), লালবাগে পাবলিক টয়লেট রয়েছে।

এর বাইরে সম্প্রতি কমলাপুর রেল স্টেশনে আরেকটি আধুনিক পাবলিক টয়লেট স্থাপন করেছে ওয়াটার এইড। প্রতিটি পাবলিক টয়লেটেই নারী-পুরুষের আলাদা ব্যবস্থা, গোসল, বিশুদ্ধ খাবার পানি, লকার, স্যানিটারি ন্যাপকিন বক্স, ব্রেস্ট ফিডিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে টয়লেট ব্যবহারে পাঁচ টাকা, গোসলে ১০ টাকা, বিশুদ্ধ পানি প্রতি গ্লাস ১ টাকা, লকার পাঁচ টাকা, প্রতি পিস স্যানিটারি ন্যাপকিন ১০ টাকা করে নিচ্ছে ওয়াটার এইড। তবে সেখানে ওজু এবং ব্রেস্ট ফিডিংয়ে কোনো ফি নেই।

ওয়াটার এইডের ব্যবস্থাপক বি এম জাহিদুল ইসলাম ওই চুক্তির আওতায় আমরা ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, কমলাপুর রেলস্টেশনে ৩১টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করেছি। চুক্তির শর্ত ছিল সিটি করপোরেশন ও রেলওয়ে জায়গা দেবে। আমরা ভবন বা স্থাপনা নির্মাণ করবো। আর ঢাকা ওয়াসা পানি সরবরাহ করবে।

তিনি বলেন, পাবলিক টয়লেটের নিরাপত্তা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকায় তা ব্যবহারে নারীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। তবে চাহিদার তুলনায় পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। নগরে জনসংখ্যা অনুপাতে প্রতি আধা কিলোমিটার পরপর একটি করে পাবলিক টয়লেট দরকার। এটি করা গেলে শহরের পরিবেশ উন্নয়নসহ জনস্বাস্থ্যের উপকার হবে।

জানতে চাইলে ওয়াটার এইড বাংলাদেশের পলিসি অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ডিরেক্টর পার্থ হেফাজ সেখ পাবলিক টয়লেট সংকট দূর করতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে কাজ করছি। তাদের সঙ্গে আমরা বাংলাদেশের পাবলিক টয়লেট অপারেশন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের জন্য একটি নীতিমালা তৈরি করছি, যেটি প্রায় শেষ পর্যায়ে আছে। বিমানবন্দর, শপিংমল কিংবা বাস টার্মিনালে পাবলিক টয়লেটে কী কী সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে, নীতিমালায় সেসব রাখার চেষ্টা করেছি। আমরা যেসব পাবলিক টয়লেট করেছি, সেখানে নারী-পুরুষের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে।’







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ