বৃহস্পতিবার ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ৯ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

দামি ফোনের যন্ত্রাংশ খুলে ভারত-চীন-দুবাইয়ে পাচার
প্রকাশ: শনিবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৩, ১১:২১ পূর্বাহ্ণ

দেশে আইফোন চুরির বেশ কয়েকটি চক্রের সন্ধান মিলেছে। এদের কাজ নির্দিষ্ট স্থানে কিছু ব্যক্তিকে টার্গেট করে আইফোন চুরি করা। চোরচক্র তারকা অভিনেতা-অভিনেত্রী-ক্রিকেটার-রাজনীতিককেও ছাড়ে না। দেশ-বিদেশে চাহিদা থাকায় এ ফোন সহজেই উচ্চমূল্যে বিক্রি করা যায়। লোকেশন ট্র্যাকিং এড়াতে এখন যন্ত্রাংশ খুলে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব যন্ত্রাংশ আবার পাচার হচ্ছে ভারত, চীন কিংবা দুবাইয়ে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশে আইফোনের প্রতি ঝোঁক রয়েছে এক শ্রেণির মানুষের। কম দামে আইফোন কেনার জন্য বিভিন্ন মার্কেটে খোঁজ করেন ক্রেতারা। কেউ আবার অনলাইনে খোঁজেন। তবে চুরি করা আইফোন কিনে যখন একজন ব্যবহারকারী ব্যবহার করতে থাকেন তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খুব সহজেই সেই মোবাইলের লোকেশন ট্র্যাক করতে পারে।

আইফোন চুরির চারটি ধাপ রয়েছে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। প্রথম ধাপে, টার্গেট করে বিভিন্ন স্থানে মোবাইল চোরেরা আইফোন চুরি করে। দ্বিতীয় ধাপে, চোরেরা আইফোনগুলো বিভিন্ন চোরাই আইফোন ক্রেতার কাছে বিক্রি করে। তৃতীয় ধাপে, চোরাই আইফোন ক্রেতারা বড় পার্টির কাছে বিক্রি করে। চতুর্থ ধাপে, চুরির পর আইফোনগুলো সিলভার কালারের ফয়েল পেপারে মোড়ায় ও ল্যাপটপে ফ্ল্যাশ মেরে সব ডাটা মুছে ফেলে। এরপর তারা মার্কেটে বিভিন্ন পার্টির কাছে বিক্রি করে।

এছাড়া আইএমইআই পরিবর্তন করতে না পারায় ও আইফোনের খুচরা পার্টসের অনেক বেশি চাহিদা থাকায় মোবাইল সার্ভিসিংয়ের বিভিন্ন দোকানে মোবাইলের যন্ত্রাংশ যেমন- মাদারবোর্ড, ক্যামেরা, স্পিকার, চার্জার লজিক, ডিসপ্লে ও অন্য খুচরা যন্ত্রাংশ বিক্রি করে।

দোকানে অর্ডারের পর ৭-১৫ দিনে চোরাই আইফোন দেওয়া হচ্ছে: এদিকে গত কয়েক মাস টানা অভিযান পরিচালনা করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ জানতে পেরেছে, ঢাকা শহরে বিভিন্ন নামিদামি মোবাইল মার্কেটের দোকানে চোরাই মোবাইল কেনাবেচা হচ্ছে। কেউ অর্ডার করলে ৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে এসব দোকান থেকে ক্রেতারা কাঙ্ক্ষিত আইফোন পান। তবে সেটি চোরাই। যার কোনো বক্স কিংবা কেনার রশিদ থাকে না। এসব দোকানি ক্রেতাদের বলেন, এসব আইফোন লাগেজে করে বিদেশ থেকে এসেছে এজন্য মোবাইলগুলোর কোনো বক্স, টাকার রশিদ কিংবা চার্জার নেই।

গত ১৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য স্কয়ার হাসপাতালে ডাক্তার দেখানোর সময় ফয়জুন নাহার ফাতেমার নিজের আইফোন-১৩ প্রো চুরি হয়। এরপর তিনি শেরেবাংলা নগর থানায় একটি মামলা করেন। পরে মামলাটি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ অধিগ্রহণ করে রাজধানীর পরিবাগ ও হাতিরপুল এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ফয়জুন নাহার ফাতেমার আইফোনসহ ৪৬টি আইফোন উদ্ধার করে।

তার স্বামী রিয়াদ হাসান বলেন, স্কয়ার হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে গিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করছিলাম আমরা। এসময় আমার স্ত্রী তার চেয়ারে হাতব্যাগটি রেখে পাশেই রিসিপশনে যান তার সিরিয়াল কখন জানতে। হাতব্যাগটির মধ্যে ৯৮ হাজার টাকা মূল্যের ফোনটি ছিল। রিসিপশন থেকে এসে দেখেন ফোন ও ব্যাগ কিছুই নেই। আমরা হাসপাতালের সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখতে পাই এক যুবক ব্যাগটি নিয়ে দ্রুত হাসপাতাল থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। ফুটেজে দেখা গেছে আগে থেকেই ওই যুবক টার্গেট করছিল আমাদের।

গণভবন এলাকায় সাকিবের আইফোন চুরি: গত ২৬ নভেম্বর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনে এসে আইফোন হারান সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। চুরির ঘটনায় রোববার সন্ধ্যায় সাকিব শেরেবাংলা নগর থানায় একটি জিডি করেন। জিডি নম্বর-১৯১৩।

জিডিতে তিনি অভিযোগ করেন, রোববার সকাল ১০টার দিকে গণভবন এলাকার কোথাও তার আইফোন-১৫ প্রো মডেলের মোবাইল ফোনটি হারিয়ে যায়।

জানতে চাইলে শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মু. আহাদ আলী বলেন, এখন পর্যন্ত সাকিব আল হাসানের চুরি হওয়া আইফোনটি উদ্ধার করা যায়নি।

এফডিসি থেকে ফারিণের আইফোন চুরি: গত ৪ অক্টোবর রাজধানীর বিএফডিসিতে শুটিং শেষে নিজের ব্যবহৃত আইফোন ১৪ প্রো হারান ছোট পর্দার বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিণ। এ ঘটনায় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি। তবে এখন পর্যন্ত চুরি হওয়া আইফোনটি উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

দেড় মাস পর হারানো আইফোন ফিরে পান পরিকল্পনামন্ত্রী: গত ৩০ মে রাজধানীর বিজয় সরণিতে ছিনতাইয়ের শিকার হন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। এসময় তার হাতে থাকা আইফোনটি ছিনতাই হয়। প্রায় দেড় মাস পর পরিকল্পনামন্ত্রীর আইফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ। পাশাপাশি এ ঘটনায় জড়িত পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়। এ বিষয়ে ডিবি-উত্তরা বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) মো. ইমরান হোসেন মোল্লা বলেন, ‘ঢাকা শহরে শুধু আইফোন চুরির বেশ কয়েকটি চক্র রয়েছে। যারা শুধু আইফোনই চুরি করে। এসব আইফোন ঢাকার বিভিন্ন মার্কেটের চোরাই দোকানে বিক্রি করে চোরেরা। আবার ভারত, চীন কিংবা দুবাইয়ে নিয়েও বিক্রি করছে তারা। এরই মধ্যে একটি চক্রের সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের রিমান্ডে নেওয়া হলে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। সেসব তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। অভিযানে বেশ কয়েকটি চোরাই আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আইফোন চুরির পর গতি-প্রকৃতি বা লোকেশন যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শনাক্ত করতে না পারে সেজন্য সিলভার কালারের ‘ফয়েল পেপারে’ মুড়িয়ে রাখছে চোরচক্র। এতে আইফোনের অবস্থান শনাক্ত করা যাচ্ছে না। অভিনব এ উপায়ে একাধিক চক্র আইফোন চুরি করছে এভাবে।’

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক চোরাই আইফোনসহ বিভিন্ন মডেলের মোবাইল উদ্ধার করে প্রকৃত মালিকের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে এবং অসংখ্য আসামিকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। মোবাইল ফোন চুরি বা ছিনতাই হলে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ থানায়/ডিবি পুলিশকে জানাতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আইফোন কেনার ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্কতার সঙ্গে অফিসিয়াল ফোন দেখে কিনতে হবে। বিক্রেতা অবৈধ বা ভুয়া কি না তা যাচাই করে দেখতে হবে। আইফোন কেনার সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে কিনতে হবে। অল্প দামে লোভনীয় অফার পেয়ে চোরাই আইফোন কিংবা কোনো মোবাইল ফোন কিনতে উৎসাহী হবেন না। আইফোন বা মোবাইল চোরচক্র বা চোরাই আইফোন কেনাবেচা চক্রের কোনো তথ্য পেলে নিকটস্থ থানা ও ডিবি পুলিশকে জানানোর জন্য অনুরোধ রইল। মোবাইল ফোন বিশেষ করে আইফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই পাসওয়ার্ড/প্যাটার্ন লক/স্ক্রিন লক/ফিঙ্গারপ্রিন্ট/ফেস লক ব্যবহার করুন ও মাঝে মধ্যে লক/পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন।







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ