শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০২৪ ৪ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বদলে যাওয়া ঠাকুরগাঁও: উন্নয়নে খুলেছে সম্ভাবনার দ্বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ২১ জুলাই ২০২৩, ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জেলা ঠাকুরগাঁও গত ১৫ বছরে (২০০৮-২০২৩) পরিণত হয়েছে সম্ভাবনার জনপদে। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তিন মেয়াদে এই জেলায় কৃষি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। বিশেষ করে কৃষি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে। স্থানীয়রা বলছেন, ‘ঐতিহ্য ও সম্ভাবনার’ জেলায় পরিণত হয়েছে ঠাকুরগাঁও। বদলে যাওয়া এই জনপদে থেকেই ভাগ্য উন্নয়নের স্বপ্ন দেখছেন তারা। এখন তাদের সামনে এগিয়ে যাবার পালা।

জেলা প্রশাসন জানায়, ঠাকুরগাঁও জেলায় ১৫ লাখ ৩৩ হাজার মানুষের বসবাস। তাদের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। এখানে উৎপাদিত প্রধান কৃষিপণ্যে মধ্যে রয়েছে ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পাট, শাকসবজি, সরিষা, চিনা বাদাম, আম, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, আদা, হলুদ ও আখ। এরমধ্যে আলু, করলা ও আম বিদেশে রফতানিও হয়। ফলে উৎপাদিত এসব ফসলের ওপর জীবিকা নির্ভর করে এ জেলার বেশিরভাগ মানুষের।

সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষিপ্রধান ঠাকুরগাঁওয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের নানামুখী যুগোপযোগী পদক্ষেপের সুফল পাচ্ছে মানুষ। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থাপনার ফলে জেলার মোট আবাদি জমির পরিমাণ এবং কৃষিজ পণ্যের উৎপাদন দুই দশকে বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। ২০০৫-২০০৬ থেকে ২০০৭-০২০৮ অর্থবছরে ফসলের গড় নিবিড়তা ছিল ২৩২ শতাংশ, যা বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়ে ২৬৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

তথ্য বলছে, এই জেলায় ২ লাখ ৭৮ হাজার ২৬১ জন কৃষককে ‘কৃষি সহায়তা কার্ড’ প্রদান করা হয়েছে। ১ লাখ ৪৪ হাজার ১১৭ জন কৃষককে ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত জেলায় ১ লাখ ৮৫০ জন কৃষককে বিভিন্ন ধরনের কৃষি প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের কারণে সরাসরি উপকার পেয়েছেন কৃষকরা।

সদর উপজেলার বাসিন্দা আমজাদ হোসেনের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। তিনি বলেন, ‘১৫ বছরে তার জেলায় কৃষির ক্ষেত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে এখন আধুনিক ব্যবস্থার কারণে উন্নত বীজ পাওয়া যাচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ থাকায় সেচ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে। বিএনপি আমলে এমনটি ভাবা যায়নি। রাস্তাঘাট উন্নত হওয়ায় যাতায়াত সহজ হয়েছে। ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়া যাচ্ছে।’

সমতলে চা বাগান: ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সমতল ভূমিতে চা চাষের যাত্রা শুরু হয় প্রথমে পঞ্চগড়ে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আসার পর চা উৎপাদন শুরু হয় পাশের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে। এ জেলার সবচেয়ে বেশি চা চাষ হয় বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায়। বর্তমানে এ জেলার ১ হাজার ৪৫৭ একর জমিতে চা চাষ হয় এবং তাতে বছরে ৪০ কোটি টাকা আয় হয় বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

রনবাগ ও বেউরঝাড়ি সীমান্ত ফাঁড়ির কাছে অবস্থিত ইসলাম টি এস্টেটের তত্ত্বাবধায়ক মো. একরামুল জানান, পঞ্চগড়ে চা চাষের সফলতা দেখে এখানকার মানুষ চা চাষে উৎসাহিত হয়েছেন। ফলে চা বাগান হওয়ায় এলাকার কৃষকরা লাভবান হয়েছেন।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন: জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, গত দুই দশকের কম সময়ে ঠাকুরগাঁওয়ে ৩৩ কিলোমিটার রাস্তা প্রশস্ত করা হয়েছে। এটি এশিয়ান হাইওয়ে-২-এর উপযুক্ত করে নির্মাণ করা হয়েছে। এলজিইডির আওতায় ২০০৮ সাল পর্যন্ত ৪৪৫ কিলোমিটার পল্লি সড়ক নির্মিত হলেও ২০০৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ১ হাজার ১৫৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ৪৮০টি পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে এ জেলায় এখন মোট পাকা সড়কের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার। ২০০৬ সাল পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও জেলায় এলজিইডির ব্রিজ ও কালভার্ট ছিল ১১৫৬টি (মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৫৮৫ মিটার)। এরপর ২০২২ সাল পর্যন্ত আরও ৫০৩১টি (মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭৭০ মিটার) ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে এলজিইডির নির্মিত মোট ব্রিজ ও কালভার্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭১৮৭টিতে (মোট দৈর্ঘ্য ২৫২৮৫ মিটার)।

এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পাঁচ উপজেলায় ২০১৮-২০২২ সাল পর্যন্ত ৩৯ দশমিক ৫ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ককে এইচবিবি (হেরিং বোন বন্ড) সড়কে উন্নীত করা হয়। ২০০৯-২০২২ পর্যন্ত সেতু ও কালভার্ট নির্মিত হয়েছে ৪৮০টি, যার মোট দৈর্ঘ্য ৯৬০০ মিটার। জেলায় রেলট্র্যাক নির্মাণ, রেল যোগাযোগে নতুন কোচ চালু, আধুনিক রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ ইত্যাদি খাতে বিগত ২০ বছরে এ জনপদের আমূল পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে ঠাকুরগাঁওয়ের সঙ্গে অন্য জেলার আধুনিক রেল যোগাযোগ স্থাপনের জন্য মোট ৬টি ট্রেন চলাচল করছে। এরমধ্যে ৫টি আন্তনগর ও একটি লোকাল ট্রেন।

হরিপুর উপজেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘এই সরকারের আমলে সবচেয়ে বড় উন্নয়ন হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থার। এর সুফল পাচ্ছে ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ। রাস্তাঘাট ভালো হওয়ায় যাতায়াত থেকে শুরু করে কৃষিপণ্য পরিবহনেও প্রভাব পড়েছে। গ্রামীণ সড়ক পাকা হওয়ায় প্রান্তিক কৃষকরা সহজেই তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে পারছে। ফলে জনজীবনও আগের থেকে উন্নত হয়েছে।

শতভাগ বিদ্যুতের সুবিধা: জেলা প্রশাসন জানায়, ঠাকুরগাঁও জেলায় ১১৫ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ২০২২ সালে স্থাপিত হয়েছে। সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের গৌরীপুরে ‘ইপিভি ঠাকুরগাঁও লিমিটেড’ নামে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জাতীয় গ্রিডের বদৌলতে জেলার শতভাগ মানুষকে বিদ্যুৎসেবার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। ২০০৬ সালে ঠাকুরগাঁওয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল মাত্র ৩০ মেগাওয়াট, যা বর্তমানে ১০৪ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। ২০০৬ সালে ৬০ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পেলেও ২০২৩ সালে তা শতভাগে পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ সুবিধার ফলে জেলায় নতুন নতুন কলকারখানা গড়ে উঠছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ফলে উন্নতি হয়েছে স্বাস্থ্য খাতেরও।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ম্যানেজার (অপারেশন) মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ১৩২ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার। পিক আওয়ারে ১১৪ মেগাওয়াট চাহিদা থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী ১১৫ মেগাওয়াট উৎপাদন করা হয়। এতে জেলার বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে।

রানীশংকৈল উপজেলার বাসিন্দা আফজাল হোসেন বলেন, ‘বর্তমান সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ পাচ্ছি ঠিকঠাক। কৃষি জমিতে সময় মতো সেচ দেওয়া যাচ্ছে। বাতি-ফ্যান চলছে। অনেকের বাড়িতে এখন ফ্রিজ রয়েছে। তবে ইদানীং ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়ায় সমস্যা হচ্ছে। এই সমস্যা নাকি শিগগিরই মিটে যাবে, গেলেই ভালো।’

জেলা প্রশাসক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে এ জেলার মানুষ। চাহিদার চেয়ে বিদ্যুতের উৎপাদন বেশি হওয়ায় উদ্বৃত্তও থাকছে। ফলে আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে মানুষের।’

শিক্ষার উন্নয়ন: ঠাকুরগাঁও জেলায় ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল ৪২৯টি। আওয়ামী লীগের তিন মেয়াদের শাসনামলে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৯৯টিতে। ২০০৬ সাল পর্যন্ত মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল যথাক্রমে ৩৪৬, ৩৫, ৬৫ ও ৭টি। বর্তমানে এই সংখ্যা যথাক্রমে ৩৬৬, ৬০, ১২৩ ও ২৭টি। এ ছাড়া মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন, শতভাগ উপবৃত্তি কার্যক্রম, শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব ও ডিজিটাল স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপন, ছাত্রছাত্রীদের মাঝে ল্যাপটপ বিতরণ, বিদ্যালয়ে ওয়াই-ফাই সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে।

‘ঠাকুরগাঁও রোড বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে’ গিয়ে দেখা গেছে, শিশু শিক্ষার্থীরা মাল্টিমিডিয়া ক্লাসে বসে শিখছে। শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবে কম্পিউটার শিখছে। সেখানকার দশম শ্রেণির ছাত্রী মাইসা ফারজানা জানায়, কম্পিউটারের বিভিন্ন ধরনের প্রোগ্রাম শিখেছি এখানে। এর মাধ্যমে আয়ের পথ খুলবে। পরবর্তী সময়ে আমি স্বনির্ভর হতে পারবো।’

এ ছাড়া ২০০৬ সালে ঠাকুরগাঁও জেলার ৪টি উপজেলায় ৩১ শয্যাবিশিষ্ট পাঁচটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতাল ছিল। বর্তমানে জেলায় পাঁচটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালগুলো ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। জেলার একমাত্র ১০০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতাল এখন আটতলা বিশিষ্ট ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল। করোনা মহামারির সময় এই উন্নয়নের সুফল পেয়েছে সাধারণ মানুষ।

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ২০০৬ সালে বয়স্ক ভাতাভোগী ছিল ১৩ হাজার ৭৫০ জন। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা প্রায় পাঁচগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪ হাজার ৭৩০ জনে। বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা ২০০৯ সালে পেতো ৭ হাজার ২৫০ জন। ২০২৩ সালে তা ছয়গুণ বেড়ে ৪২ হাজার ৫১০ জনে দাঁড়িয়েছে। ২০০৬ সালে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা পেতো ১ হাজার ৩২৫ জন, বর্তমানে পাচ্ছে ৩০ হাজার ২২৫ জন। আরও বিভিন্ন ধরনের ভাতা, শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি, আধুনিক সুযোগ-সুবিধার মডেল মসজিদ কাম ইসলামিক স্টাডি সেন্টার নির্মাণ, শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) স্থাপন, মুজিববর্ষ উপলক্ষে আশ্রয়ণ প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে।







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ