মঙ্গলবার ০৫ মার্চ ২০২৪ ২১ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

সংসদ নির্বাচনে কমবে ভোটকেন্দ্র
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৬ মে ২০২৩, ১১:২৩ পূর্বাহ্ণ

জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের নতুন নীতিমালা করেছে নির্বাচন কমিশন। বৃহস্পতিবার (২৫ মে) আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে অনুষ্ঠিত কমিশন সভায় এ নীতিমালা চূড়ান্ত হয়। নতুন নীতিমালায় ভোটকেন্দ্র স্থাপনে ইসির একচ্ছত্র ক্ষমতা খর্ব হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন যুক্ত হচ্ছে ভোটকেন্দ্র নির্ধারণের সঙ্গে। নতুন নীতিমালায় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা কমে আসবে। নির্বাচন কমিশন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

ইসির অনুমোদিত ভোটকেন্দ্র স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালায়- ভোটকেন্দ্র কোন প্রতিষ্ঠানে হবে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা রাজনীতিক, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে আগের নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র বহাল রাখার বাধ্যবাধকতাও তুলে দেওয়া হয়েছে।

এর আগে নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমানের নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি এই নীতিমালার খসড়া তৈরি করেছে।

চলতি বছরের ডিসেম্বর বা আগামী জানুয়ারিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ওই নির্বাচন সামনে রেখে এ নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। এ নীতিমালার আলোকে আগামী সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হবে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও) এর ৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র নির্ধারণের ক্ষমতা ইসির। এতদিন কমিশনের পক্ষে নির্বাচন কর্মকর্তারা ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ করতেন। ইসি কর্মকর্তাদের নির্ধারিত খসড়া ভোটকেন্দ্রের তালিকা রিটার্নিং কর্মকর্তার মাধ্যমে ইসিতে পাঠানো হলে পরে তার গেজেট করা হতো। নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে ইসির কর্মকর্তাদের ভোটকেন্দ্র নির্ধারণের একক ক্ষমতা থাকবে না। স্থানীয় প্রশাসনের নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশে ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করা হবে।

যেভাবে নির্ধারিত হবে ভোটকেন্দ্র: জানা গেছে, বিগত নির্বাচনগুলোতে ইসির নিজস্ব কর্মকর্তারা ভোটকেন্দ্র নির্ধারণের কাজ করে আসছিলেন। এবার সেখানে নতুন নিয়ম করা হয়েছে। নীতিমালায় ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ কার্যক্রমকে মহানগর বা জেলা এবং উপজেলা— এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। মহানগর ও জেলা পর্যায়ের ভোটকেন্দ্র নির্ধারণে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে সাত সদস্যের কমিটি থাকবে। কমিটির সদস্যরা হলেন— বিভাগীয় কমিশনারের প্রতিনিধি, পুলিশ সুপার (এসপি), সংশ্লিষ্ট মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রতিনিধি, জেলা শিক্ষা অফিসার ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এ কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। উপজেলা পর্যায়ের ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ কমিটির প্রধান হবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। কমিটির সদস্যরা হলেন— উপজেলা শিক্ষা অফিসার, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)। উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এ কমিটির সদস্য সচিব হবেন।

ভোটকেন্দ্র বাছাই প্রক্রিয়া সম্পর্কে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে— উপজেলা বা থানা নির্বাচন কর্মকর্তা খসড়া ভোটকেন্দ্রের তালিকা উপজেলা কমিটির কাছে উপস্থাপন করবেন। কমিটির সবার মতামতের ভিত্তিতে ভোটকেন্দ্রের খসড়া চূড়ান্ত করবেন। ওই খসড়া জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে পাঠাবেন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা। এরপর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ওই তালিকা জেলা ও মহানগর কমিটি সভায় উপস্থাপন করবেন। কমিটির সদস্যরা একই প্রক্রিয়ায় তাদের মতামত জানাবেন। প্রয়োজনে সরেজমিন যাবেন। এভাবে ভোটকেন্দ্রের তালিকা তৈরি করতে হবে।

ভোটকেন্দ্র নির্ধারণে স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করার যৌক্তিকতা হিসেবে বলা হয়েছে, শিক্ষা অফিসাররা তার আওতাধীন এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত অবস্থান ও যাতায়াত সম্পর্কে বিশেষভাবে অবগত থাকেন। আর পুলিশ কর্মকর্তা ওইসব কেন্দ্রের যাতায়াত ব্যবস্থা ও সার্বিক নিরাপত্তা সম্পর্কে অবগত থাকেন। আর জেলা প্রশাসক ও ইউএনও সংশ্লিষ্ট এলাকার সরকারি ও নির্বাচন কমিশনের নানাবিধ কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেন। তাই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অফিসারদের সমন্বয়ে কমিটির মাধ্যমে ভোটকেন্দ্র স্থাপন কার্যক্রম অধিকতর সহজ ও সুষ্ঠু হবে।

গত নির্বাচনের কেন্দ্র পরিবর্তন করা যাবে: ইসির বিদ্যমান নীতিমালায় নদীভাঙন বা অন্য কোনও কারণে বিলুপ্ত না হলে আগের ভোটকেন্দ্র বহাল রাখার বিধান রয়েছে। তবে নতুন নীতিমালায় ওই বিধান তুলে দেওয়া হয়েছে। সেখানে যাতায়াত ও অবকাঠামোগত সুবিধার বিবেচনায় ভোটকেন্দ্র পরিবর্তন করার জন্য বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব করার কথা বলা হয়।

আগের ভোটকেন্দ্র পরিবর্তনের যৌক্তিকতা হিসেবে বলা হয়েছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ইতোমধ্যে অনেক নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এছাড়া পুরনো অনেক স্থাপনা সংস্কার করে, কিংবা নিকটবর্তী নতুন স্থানে নতুন স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। ভোটকেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে ভোট দেওয়ার সুবিধা বিবেচনা করে নতুন স্থাপনা কেন্দ্রের জন্য নির্ধারণ করা যাবে। তবে বিগত নির্বাচনে যেসব কেন্দ্রে গোলযোগ হয়েছে বা বর্তমানে কোনও সম্ভাব্য প্রার্থীর প্রভাবাধীন থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্র নির্ধারণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার জন্য নীতিমালায় বলা হয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, প্রতিটি নতুন ভোটকেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানে যতদূর সম্ভব ভোটকেন্দ্র স্থাপন না করার জন্য নীতিমালায় বলা হয়েছে। ভোটকেন্দ্র স্থাপনে যাতায়াত ব্যবস্থা ও ওই প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা চৌহদ্দি আছে কিনা, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

জাতীয় নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র স্থাপনে নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চত করে কমিশনার মো. আলমগীর বলেন, ‘পূর্বের নীতিমালা বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন করে এই নীতিমালা করা হয়েছে।’

তিনি জানান, উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক প্রধান ইউএনও’র নেতৃত্বে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। শিক্ষা অফিসার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর অবস্থান, অবকাঠামোর অবস্থা ও যাতায়াত সম্পর্কে অবগত থাকেন। আর স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন সেখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বলতে পারেন। এজন্য তাদের সবাইকে সম্পৃক্ত করে জাতীয় নির্বাচনে কেন্দ্র স্থাপনে কমিটি গঠন করা হবে। কমিটি খসড়া করলেও চূড়ান্ত করবেন রিটার্নিং অফিসার। রিটার্নিং অফিসার এটা চূড়ান্ত করে ইসিতে পাঠালে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।

মো. আলমগীর বলেন, ‘নতুন নীতিমালার আলোকে ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ করলে জাতীয় নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র কমে যাবে।’ ভোটকেন্দ্র কমার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বর্তমান যতগুলো কেন্দ্র আছে তাতে পর্যাপ্ত সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে কেন্দ্র কমলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কিছুটা বেশি মোতায়েন করা যাবে।’

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে ৪০ হাজার ১৮৩টি ভোট কেন্দ্র ছিলে।

যা আছে নতুন নীতিমালায়

নির্বাচন কমিশন ‍সূত্রে জানা গেছে, নতুন নীতিমালায় গড়ে ৩ হাজার ভোটারের জন্য একটি ভোটকেন্দ্র, গড়ে ৫০০ জন পুরুষ ও ৪০০ জন নারী ভোটারের জন্য একটি ভোট কক্ষ স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। অবশ্য ইভিমে ভোটগ্রহণে পুরুষ ভোটারের জন্য ৪০০ ও নারীর জন্য ৩৫০ জনে একটি করে ভোটকক্ষ স্থাপনের কথা বলা হয়েছে।

এতে যাতায়াতের সুবিধা, দুটি কেন্দ্রের মধ্যে ৩ কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব না হওয়া এবং একটি কেন্দ্রের খুব কাছাকাছি অন্য কেন্দ্র স্থাপন না করার কথাও বলা হয়।

কেন্দ্র স্থাপনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়টি বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। এতে বিগত নির্বাচনে যেসব কেন্দ্রে গোলযোগ বা নির্বাচনি পরিবেশ বিঘ্নিত হয়েছে বা বর্তমানে কোনও সম্ভাব্য প্রার্থীর প্রভাব থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব স্থাপনায় ভোটকেন্দ্র স্থাপনে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে। বিগত নির্বাচনে ব্যবহৃত কেন্দ্রগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হলে বা পর্যাপ্ত সংখ্যক কক্ষ বা যাতায়াত সুবিধা না থাকলে, অপেক্ষকৃত উপযুক্ত স্থাপনায় ভোটকেন্দ্র স্থাপনের কথা বলা হয়। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তিবর্গ বা রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা উল্লেখ করা হয়।বিগত নির্বাচনে ব্যবহৃত কোনও স্থাপনা নদী ভাঙন বা অন্য কোনও কারণে বিলুপ্ত বা ব্যবহার অনুপযোগী হলে, ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে, গণমান্য ব্যক্তিবর্গ বা রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন স্থাপনায় কেন্দ্র স্থাপন করার প্রস্তাব করা যাবে বলে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে। কেন্দ্র স্থাপনে সরকারি ভবনকে প্রাধান্য দিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা পরিচালিত কমিউনিট সেন্টার, ঘুর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ও অন্যান্য অফিস ভবনে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা যাবে। কবরস্থান, শ্মশান, হাটবাজার, সংকীর্ণ অলি-গলি-এমন স্থানে কেন্দ্র স্থাপন করা যাবে না।

কম জনবসতীপূর্ণ, দূর্গম পার্বত্য এলাকা, চর বা দ্বীপাঞ্চল এবং প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে ভোটকেন্দ্র স্থাপনে নীতিমালায় শিথিলতা থাকবে।

অস্থায়ী ভোটকেন্দ্র স্থাপনে তার অবস্থান সুস্পষ্ট করে উল্লেখসহ ভোটকেন্দ্র স্থাপনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে প্রত্যয়ন করতে হবে।

নীতিমালায় ভোটদানের ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীদের পৃথকভাবে ভোটকক্ষে প্রবেশ ও বের হওয়ার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। ভোট প্রদানে বয়স্ক পুরুষ ও নারী এবং প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গ, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও দুধপানকারী শিশু সন্তানের মায়েদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ